সংস্কৃতি কি? – সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

সংস্কৃতি হল একটি জটিল সামগ্রিকতা যাতে অন্তর্গত আছে জ্ঞান, বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিল্প, আইন, রাজনীতি, আচার এবং সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মানুষের দ্বারা অর্জিত অন্য যেকোনো সম্ভাব্য সামর্থ্য বা অভ্যাস।

সংস্কৃতির কিছু সাধারণ উপাদান হল:

    • ভাষা: ভাষা হল সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
    • ধর্ম: ধর্ম হল একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা যা মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করে।
    • শিল্প: শিল্প হল মানুষের সৃজনশীলতার প্রকাশ। এটি সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, এবং অন্যান্য রূপের মধ্যে প্রকাশিত হতে পারে।
    • আইন: আইন হল সমাজের নিয়ম এবং নিয়মকানুন। এটি মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
    • রাজনীতি: রাজনীতি হল সমাজের শাসনব্যবস্থা। এটি সমাজের নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত।
    • আচার: আচার হল সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি এবং প্রথা। এগুলি মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সংস্কৃতি হল একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। এটি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। নতুন ধারণা, বিশ্বাস, এবং প্রথার আবির্ভাবের সাথে সাথে সংস্কৃতি বিকশিত হয়।

সংস্কৃতি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানুষের আচরণ, চিন্তাভাবনা, এবং মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি একটি সমাজের ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।

সংস্কৃতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল:

    • মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা: সংস্কৃতি মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মানুষের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয় তা নির্ধারণ করে।
    • মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করা: সংস্কৃতি মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে। এটি মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
    • মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা: সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। এটি একই ভাষা, ধর্ম, বা ঐতিহ্য শেয়ার করে এমন মানুষের মধ্যে বোঝাপড়াকে সহজ করে তোলে।
    • মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলা: সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। এটি মানুষকে তাদের চারপাশের বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করে এবং তাদের জীবনে উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য দেয়।

সংস্কৃতি একটি জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি মানুষের আচরণ, চিন্তাভাবনা, এবং মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে।

সংস্কৃতির কিছু সংজ্ঞা

নৃবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ বোয়াস বলেন,বাংলাদেশে আমরা যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করছি, তার অনেক পুরনো। এই সংস্কৃতিক. কিছু বৈশিষ্ট্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মেলে।

কিছু বৈশিষ্ট আলাদা করে শনাক্ত করা যায়। নৃতাত্ত্বিক বিচারে,  কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশে, ধর্মানুপ্রেরণায়, বর্ণপ্রথায়, উৎপাদন পদ্ধতির অনেকখানিতে বাঙালি সংস্কৃতির মিল পাওয়া যাবে কোটা উপমহাদেশে সঙ্গে।

বাংলা ভাষা  ইন্দ্র ইন্দো- ইউরোপীয়  গোষ্ঠীর বাসা এই গোষ্ঠীর অন্যান্য বাসা ছড়িয়ে আছে উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে।

বাংলার অনেক রীতিনীতিরও  মিল খুঁজে পাওয়া যায় সেই এলাকায় ।আবার দান্তের হলদি পান সুপারির ব্যবহার মিল পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে।

সেলাইছাড়া কাপড় পরার বিষয়েও বেশি মিল  ঐ এলাকার সঙ্গে। এর কারণ, বাংলার আদি জনপ্রবাহছিল প্রাক -আর্য জনগোষ্ঠী সম্ভূত।

পরে এর ওপরে আর্য  জনগোষ্ঠী ।ও তাদের প্রভাব এসে পড়ে। সে প্রভাব এত তীব্র ছিল যে, তাই দেশজ উপকরণে পরিণত হয়।

পরে মুসলমানরা যখন এদের জয় করলেন, তখন তারা সে সংস্কৃতি নিয়ে এলে্‌ তাতে তুর্কি আরব ইরান মধ্য এশিয়ার সাংস্কৃতিক উপাদানের মিশেল।

সেখান থেকে অনেক কিছু বাঙালি সংস্কৃতিতে। তারপর এদেশে যখন ইউরোপীয়রা এলেন, তখন তারা এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ ঘটালেন আরো  একটি সংস্কৃতির।

এভাবে বাংলার সংস্কৃতিতে অনেক সংস্কৃতি- প্রবাহের তান এসে মিশেছে। আর নানা উৎসের দানের আমাদের সংস্কৃতি রয়েছে পুষ্ট।

 

সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী Melville J.  Herskovits তাঁর Cultural Anthropology(1955)  গ্রন্থে সংস্কৃতির কতকগুলা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

তার মতে,বাংলার প্রকৃতি ও ভূগোলইক অবস্থান আমাদের সংস্কৃতিতে দান করেছে স্বাতন্ত্র্য।

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের   দরুন বাংলায় বিভিন্ন রাজত্ব যেমন স্থায়িত্ব লাভ করতে সমর্থ হয়েছে, তেমনি বাংলার এই বিচ্ছিন্নতার ফলে ধর্মমতের ক্ষেত্রে বিদ্রোহ ও উদ্ভাবন দেখা দিয়েছে।

বাংলার সাহিত্য – সংগীতেরক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যেরলক্ষ করা যায়।

  • বাংলার প্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের সংস্কৃতিতে দান করেছে ।
  • সংস্কৃতি বলতে আমরা সাধারণত সাহিত্য-শিল্প নৃত্যগীতবাদ্য  বুঝে থাকি ।
  • সংস্কৃতি তার বিভিন্নমূখী অংশ অনুযায়ী বিভাজনযোগ্য।
  •   সংস্কৃতি বলতে  মুখ্যত দুটো ব্যাপার বুঝায় ; বস্তুগত সংস্কৃতি, আর মানস- সংস্কৃতি।
  • সংস্কৃতি পরিবর্তনীয়।
  • ,সংস্কৃতি শিখতে বা অর্জন করতে হয়।
  • সংস্কৃতি কাঠামোভিত্তিক।

সংস্কৃতির বিশ্বজনীনতা/সর্বজনীনতা

সর্পদেবী মহাত্মা   মনসার  মাহাত্মা  গান ভিত্তি করে লেখা মনোসামঙ্গল  কাব্যের উদ্ভব পূর্ববঙ্গের  জলাভূমিতে, পশ্চিমবঙ্গের রুক্ষ মাটিতে বিকাশ বৈষ্ণব পদাবলীর।

নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে ভাটিয়ালি গানের বিস্তার, শুল্ক উত্তরবঙ্গে ভাওয়াইয়, আর  বাংলা পশ্চিমাঞ্চলে কীর্তন ও বাউলের।

শিল্প সামগ্রী লভ্যতা ও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। তাই বাংলার স্থাপত্যে  পাথরের চেয়েও আর মাটির প্রাধান্য, মৃতফলক এখানকার অন্যান্য সৃষ্টি।

বাংলার ভাস্কর্যেও মাটির প্রাধান্য আর সেইসঙ্গে দেখা যায় এক ধরনের সামগ্রী ওপরে অন্য ধরনের সামগ্রির উপযোগী শিল্পসৃষ্টির প্রসার।

অন্যদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে যে,বাংলার মানুষ সংস্কৃত প্রধানত আশ্রয় করেছে সাহিত্য ও সংগীত,অধ্যাত্মচিন্তা ও দর্শনকে।

স্বল্প হলেও স্থাপত্য ,ভাস্কর্য চিত্রকলার ক্ষেত্রে বাংলা  অবদান আছে। কিন্তু বিজ্ঞান ও গণিতের সাধনার তেমন  ঐতিহ্য বাংলা গড়ে উঠেনি ।

ফলিত বিজ্ঞানের একটি ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বাংলার একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু তাও ছিল সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলার অগ্রগতি দেখা দিয়েছল মূলত কারুশিল্পে ।

তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই কারুশিল্প বিকশিত  হলেও  এর প্রযুক্তিতে বিপ্লবিক  কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হয়েছে ইংরেজ আমলে। তবে সে প্রযুক্তি বাংলা নিজস্ব সৃষ্টি নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে ধার করা।

 

সংস্কৃতি শিখতে হয়

মানুষের আচার-ব্যবহারই হচ্ছে সংস্কৃতি। বাংলা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য  ফরিস্ফুট হতে থাকে খ্রিষ্টিয় সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর থেকে।

এই  স্বাতন্ত্র্য দেখা দেয় শাসন- ব্যবস্থায় ,সামাজিক জীবনে ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও লিপির বিকাশ সে  স্বাতন্ত্র্যকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

বহিরাগত মুসলমানরা এদের জয় করেন  ত্রয়োদশ শতাব্দী্র শুরুত মুসলমান শাসকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার করে

তার বিকাশে সহায়কতা করেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে মোঘলরা বাংলাদেশ জয় করেন। মুঘল আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আগের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেনি, তবে একটা  বৃহত্তর পরিবেশের সঙ্গে তখন বাংলা সংস্কৃতির যোগ ঘটে।

তারপর আঠারো শতকের মধ্যভাগে ইংরেজ শাসক প্রবর্তিত হলে যোগাযোগের পরিধি আরো  বিস্মৃত হয় ; বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার যোগ সাধিত হয়।

ঐ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের উচ্চবর্গের সংস্কৃতির সঙ্গে নিম্নবর্গের সংস্কৃতি কিছু কিছু ভেদ ছিল। কারুশিল্পের ক্ষেত্রে ভেদতা খুব চোখে পড়ে।

এর একটা ধারা ছিল উচ্চ শ্রেণীর ভোগ্য – রুপোর কাজ হাতের কাজ রেশমি ও উঁচু মানের সুতি কাপড়ের শিল্প; অন্নদাতা ছিল সাধারণের ভোগ্য – শাখের পিতলের কাজ নকশী কাথা পার্টি আলপনা।

সমাজের উঁচু পর্যায়ের সংস্কৃত বা  ফারসির যে চর্চা হতো তাই নিচু স্তরকে স্পর্শ করে নি। ধ্রুপদী সংগীতঃ লোকসংগীত চর্চার মধ্যে ও এমনই পার্থক্য ছিল।

লোকসাহিত্য ও শিষ্ট সাহিত্যের ভেদ ও ছিল। তবে বাংলা সাহিত্য ও  সঙ্গীত সমাজের সকল স্তরের স্পর্শ করতে সমর্থ  হয়েছিল। এইজন্যে বাংলার মানুষ -সংস্কৃতিতে সবচেয়ে প্রাধান্য সাহিত্য ও সংগীতের।

 

সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

সাংস্কৃতি কখনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়। সবসময় এটি পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে এখন অবধি মানুষের সংস্কৃতি  স্থান কাল পাত্র ভেদে পরিবর্তিত হয়ে আসছে।

পৃথিবীতে কোন সংস্কৃতিই একবারে স্থির নয়। পশুশিকারের উপর নির্ভর করা গোষ্ঠী কিংবা বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীদের সংস্কৃতিও ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়৷ সাংস্কৃরিক পরিবর্তনের অনেকগুলো কারণ দেখা যায়।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *